নাজিম জাওয়াদ:: “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই” কবিতাটির সাথে আমরা কম বেশি সবায় পরিচিত। ছোটদের পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। সেই থেকেই বাবুই পাখির সাথে আমাদের সখ্যতা ।
শৈশবে একবার নানুর বাড়ি ঘুরতে গিয়ে আমার প্রথম বাবুই পাখির সাথে পরিচয় হয়। খোলা মাঠ। মাঠজুড়ে সবুজ ঘাস। মাঠের দুদিকে তালগাছের সারি। সেই গাছগুলো জুড়েই বাবুই পাখির বাসা। বাবুই পাখির এমন সাজানো সংসার দেখে যে কারো ঈর্ষা হবে।
সুন্দর নির্মাণশৈলীর জন্য বাবুইকে শৈল্পিক কারিগরের খেতাব দেয়া হয়েছে । এই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা যে কারও নজর কাড়বে। এদের বাসা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনই টেকসই। তাদের শৈল্পিক চিন্তা এতই প্রবল যে ঝড়-বৃষ্টিতেও তাদের ঘরের কোনো ক্ষতি হবে না। বাবুই অন্যান্য গাছে বাসা বাঁধলেও তালগাছ তাদের প্রথম পছন্দ।
বাবুই পাখির বাসা উল্টানো কলসির মতো। বাসা বানানোর ক্ষেত্রে বাবুই কোন আলসেমী করে না। প্রথমে ঠোঁট দিয়ে ঘাসের স্তূপ ছাড়ায়। তারপর পেট দিয়ে ঘষে গোল অবয়ব তৈরি করে। শুরুতে দুটি গর্ত থাকে। পরে একপাশ বন্ধ করে অন্যপাশে ডিম রাখার জায়গাও তৈরি করে। বাবুই পাখি বেশ চতুর। রাতে বাসায় আলো জ্বালাতে জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে আসে।
বাবুই পাখির আরেক নাম তাঁতি পাখি। বন-জঙ্গলে ও ঘাসবনে বাবুই পাখির বিচরণ বেশি । তবে গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝেও এদের দেখা মিলে । সচরাচর বীজ, ধান, ভাত, পোকা-মাকড়, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা ইত্যাদি খেয়ে এরা জীবন ধারণ করে।
বাংলাদেশে তিন ধরনের বাবুই দেখতে পাওয়া যায়। দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই। কয়েক প্রজাতির বাবুই একাধিক কক্ষের বাসা তৈরি করে থাকে। নিজের ঘর সাজাতে তাদের কোনো ক্লান্তি নেই। এরা দলবদ্ধ জীবনযাপন পছন্দ করে। বাবুই লম্বায় ১৪-১৫ সেন্টিমিটার ও ওজনে ১৮-২২ গ্রাম হয়ে থাকে।
তবে পুরুষ ও স্ত্রীর দেহের রঙে পার্থক্য দৃশ্যমান। প্রজনন মৌসুমে পুরুষের দেহের মাথার চাঁদি সোনালি-হলুদ হয়ে যায়। কান-ঢাকনি ও গাল হালকা বাদামি থেকে সাদা হয়। ঘাড় ধূসর-কালো ও গলা সাদা। বুকে চওড়া কালো ফিতা। পেট ফিকে সাদা, যাতে হালকা বাদামি বা হলদের ছোঁয়া। পিঠে কালচে লম্বালম্বি দাগ।
গ্রীষ্মকাল হচ্ছে বাবুই পাখিদের প্রজনন ঋতু। এরা তখন ২-৪টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো থেকে ১৭ দিনের ভেতর বাচ্চা ফুঁটে বের হয়। পড়ে বাচ্চা বাবুইরা একটু বড় হলে ধীরে ধীরে অন্যত্র পাড়ি জমায়।
এক সময় গ্রামাঞ্চলে এই শৈল্পিক পাখির সন্ধানে ফটোগ্রাফাররা আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতেন। তবে বর্তমানে তেমন একটা বাবুই পাখি চোখে পড়ে না। বাবুই এখন পাখি বিরল প্রকৃতির। কমছে তাল গাছ বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখি।