ঢাকা শুক্রবার, এপ্রিল ৪, ২০২৫

Popular bangla online news portal

Rupalibank

পথশিশুদের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ


নিউজ ডেস্ক
১৬:৩৮ - বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০২৩
পথশিশুদের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

প্রত্যুষ ইসলাম :: বাবাকে জীবনে চোখে দেখিনি জন্মের দুই বছর পর মা মারা যায়। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের আদর যত্ন কেমন হয় সেটাও অনুধাবন করতে পারে না। চেষ্টা করে মায়ের চেহারাটা মনে করতে কিন্তু যখন মনে করতে পারে না তখন অনেক কষ্ট হয়। কথাগুলো বলছিল ১১ বছর বয়সী ছালমা নামে এক পথশিশু। 


রাকিব নামে আরেক পথশিশু জানায়, আমার মা মারা যাবার পর আমার শুধু একটা ভাই আছিল। ভাইয়া বিয়ে করার পর ভাবি ভাইকে বলে তুমি যাও নাকি বউ চাও? ভাই বলে দুজনরেই চায়। পরে ভাবি আমার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেলে ভাই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সে বলে আমি পড়ালেখা করতে চাই অনেক বড় চাকরি করতে চাই।


রাকিব ও সালমার মত এমন অসংখ্য পথ শিশু আছে যারা পার্ক, ফুটপাত কিংবা বিভিন্ন রেল স্টেশনে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেক সময় তারা ক্ষুধার তাড়নায় অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে।


ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সারাদেশে প্রায় ১০ লাখের বেশি পথ শিশু আছে এবং বেশিরভাগ পথ শিশু ঢাকায় থাকে। যারা সকল ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।


আমরা কি কখনো ভেবেছি সেই শিশুরা এখন শীতের রাতগুলোতে কিভাবে থাকেন? বালিশ ছাড়া কাঁথা ছাড়া কম্বল ছাড়া তাদের কতটুকু কষ্ট হয়? 


আমরা দেশ উন্নয়ন করেছি এই করেছি সেই করেছি একই সাথে আমরা পথশিশুদেরও উন্নয়ন করেছি। নাহলে তাদের সংখ্যা বাড়ছে কিভাবে?


ছোট থেকেই শুনে এসেছি যে আজকের শিশুরাই হলো আগামীর ভবিষ্যৎ। আচ্ছা সেটা কি পথ শিশুদের বাদ দিয়ে বলা হয়?


ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সার্ভেন্ট স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২ জরিপ মতে, ৮২ শতাংশ পথশিশুই ছেলে। তাদের মধ্যে ১৩ শতাংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কারণ বেশিরভাগ সৎ মা তাদের থাকতে দেয় না এবং ৬ শতাংশ এতিম অথবা বাবা মা বেঁচে আছে কিনা জানা নেই। 


বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথ শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ শিশু প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মাদকাসক্ত।

এদের বেশিরভাগের বয়স ৭ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। বর্তমানে যারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে আছে তাদের বেশিরভাগই পথশিশু কিংবা পূর্বে সুস্থ পরিবেশে বড় হয়নি। তারা বিভিন্ন সময় চুরি ছিনতাইসহ অনেক ধরনের অপকর্ম করছে।


বেসরকারি একটি তথ্যসূত্র বলছে, বাংলাদেশের প্রতিবছর ১৫ হাজার ছেলে শিশু এবং ১০ হাজার মেয়ে শিশু পাচার হচ্ছে।

এছাড়াও প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হয় পথশিশু মেয়েরা।


সরকার ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করে কিন্তু এতে করে কতটুকু কাজ হয়েছে? আদৌ কি পথশিশুদের সংখ্যা কমানো যাচ্ছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে ৬০ থেকে ৮০ জন রাখা হয়। কিন্তু দেশে এত পূর্ণবাসন কেন্দ্র নেই যেগুলোতে ১০ লাখ শিশুকে রাখা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পথ শিশুদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যা ২০২৪ সালের শেষদিকে ১৬ লাখে উন্নীত হবে। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে খুবই অসচেতন? বিভিন্ন ধরনের টিভি চ্যানেল গুলো পূর্ণবাসন কেন্দ্রের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রচার করছে কিন্তু এর সমাধান হচ্ছে না। 


পথশিশুরা খাবারের জন্য রাস্তায় নেমে আসে কেউ কাজ করে, কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করে, আবার কেউ কেউ খাবারের জন্য চুরি করে। সেই সুযোগ নিয়ে কিছু কুচক্রী মহল শিশুদের দ্বারা বেআইনি কাজ করাচ্ছে যেমন: ইয়াবা তাদেরকে দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাচার করা হচ্ছে। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে এই সব ছোট শিশুদের কেউ সন্দেহ করবে না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাসমূহ ব্যাক্তি ,পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ কাজ। এর ফলে একদিকে যেমন শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুদের দ্বারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অনেক ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এজন্য সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে সকল শিশুদের প্রতি যেন তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় তাহলে এসব খারাপ কাজেও তাদের অনীহা জাগবে। এছাড়াও সমাজের সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য।


আমি মনে করি প্রথমত প্রত্যেকটি পথশিশু কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে তাদের খাবারের চাহিদা পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভিত্তিক পথশিশুদের খুঁজে বের করে নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত তাদেরকে পড়াশোনার মাধ্যমে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে এবং পথ শিশুদের জন্য পথ শিশু বিষয়ক একটা নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করতে হবে। যার মূল উদ্দেশ্য থাকবে পথ শিশুদের রক্ষা করা। সার্বক্ষণিক সরকারের প্রতিনিধিদের দ্বারা পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করলে এসব সমস্যা দ্রুতই সমাধান হবে। সেই সঙ্গে তাদের সব ধরনের ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে যতদিন না পর্যন্ত তারা দক্ষ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারছে। 


মাঝে মাঝেই দেখা যায় পথ শিশুরা রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকলে পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দেয় কেউ কেউ শিশুদের গায়ে আঘাতও করে। এটা খুবই নিন্দনীয় এবং অপ্রত্যাশিত কাজ। কোন শিশুর জন্মই কিন্তু পথে না সে একটি বাসায় জন্মগ্রহণ করে পরে বিভিন্ন সমস্যার কারণে সে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। আমরা যদি সবাই পথ শিশুদের সাথে ভালো ব্যবহার করি, অন্তত এক বেলা খাবার দেই এবং নিজের বা নিজেদের না পড়া পোশাকগুলো তাদেরকে দেই তাহলে তারা অনেক খুশি হবে। নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে। আর আমরা যদি তাদেরকে দেখলেই দূর ছাই দূর ছাই করি এবং তাড়িয়ে দেই তাহলে তারা নিজেদের নেতিবাচক চোখে দেখবে এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। এর ফলে দেখা যাবে তারা অপকর্মে জড়িয়ে পড়বে। তাই আমাদের সকলের এই পথশিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে।