ঢাকা মঙ্গলবার, মার্চ ৫, ২০২৪

Popular bangla online news portal

Janata Bank
Rupalibank

রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে বিরল বোম্বে গ্রুপের রক্তদান


নিউজ ডেস্ক
১৩:০৮ - রবিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২৩
রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে বিরল বোম্বে গ্রুপের রক্তদান

মো: আতিকুর রহমান: রোগীর নাম তানিয়া সুলতানা (৪৪)। দীর্ঘদিন ধরে রক্ত শূন্যতায় ভুগছেন। রাজধানীর অ্যাপোলো হাসাপাতালের ডাক্তার জানিয়েছেন তার রক্তে  হিমোগ্লোবিনের পরিমান ৫.৫। জরুরি ভিত্তিতে তাকে রক্ত প্রদান করতে হবে। কিন্তু তার রক্তের গ্রুপ এইচ/এইচ বা বোম্বে। এদিকে রক্তের এই বিরল গ্রুপ ‘বোম্বের’ তথ্যভান্ডার নেই দেশে। 

রোগীর লোক রক্তদাতা ম্যানেজে দিশেহারা। অসহায় হয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা ব্লাড ব্যাংকে বোম্বে গ্রুপের রক্তদাতার সন্ধান করেও রক্তদাতা ম্যানেজে ব্যর্থ। তাদের এই রিকুইজিশনের বিষয়ে জানতে পারেন একটি স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক শাকিল আহাম্মেদ। তাৎক্ষণিক তিনি তার সন্ধানে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোম্বে ব্লাড গ্রুপের রক্তদাতার সাথে যোগাযোগ করে রুগীর লোককে রক্তদাতা কনফার্ম করেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ০৬ টায় রক্তদাতা সফলভাবে রক্তদান সম্পন্ন করেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন রুগীর আত্মীয়স্বজন।

বোম্বে ব্লাড গ্রুপের কথা শুনে অনেকেই হয়তো বলবেন এটা আবার কেমন ব্লাড। হ্যা, এটা এক ধরনের ব্লাড গ্রুপ। এই ব্লাড গ্রুপের কথা অনেকেই জানেন না। এই গ্রুপের রক্ত খুব কম পাওয়া যায়। আমাদের পরিচিত ৮টি রক্ত গ্রুপে কোনো না কোনো অ্যান্টিজেন থাকে। কিন্তু এমন একটি রক্তের গ্রুপ আছে, যার কোনো অ্যান্টিজেন নেই, সবই অ্যান্টিবডি, মানে ‘অ-অ্যান্টিবডি’, ‘ই-অ্যান্টিবডি’ থাকে, কিন্তু কোনো অ্যান্টিজেন নেই।  এই রক্তের গ্রুপ হলো বোম্বে ব্লাড গ্রুপ, যা পৃথিবীজুড়ে সবচেয়ে দুর্লভ রক্তের গ্রুপ। বোম্বে শহরে (বর্তমানের মুম্বাই শহর) সর্বপ্রথম ১৯৫২ সালে এই রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করেন ডা. ভেডে। এই শহরের নাম অনুসারেই এই রক্তের নাম ‘বোম্বে ব্লাড গ্রুপ’। তবে এর অন্য নামও আছে ‘hh blood group’।

পরিবারে কয়েকজন হয়তো এই গ্রুপের থাকে। সেল গ্রুপিং করলে ‘ও’ ব্লাড গ্রুপের মতো দেখায়। সিরাম গ্রুপিং করলে বোম্বে সন্দেহ হয়। এরপর অ্যান্টি এইচ দিয়ে কনফার্ম করা হয়। সে জন্য সেল এবং সিরাম গ্রুপিং ভীষণ জরুরি। তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম হয়। যিনি বোম্বে তাকে যদি ‘ও’ ভেবে ট্রান্সফিউশন দেওয়া হয় তবে হিমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন হয়ে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।  বোম্বে ব্লাড গ্রুপ হলে কেবল বোম্বে দিয়েই ট্রান্সফিউশন করতে হয়। আর এটার জন্য পরিবারের সবার ব্লাড গ্রুপ চেক করতে হয়। অটোলোগাস ট্রান্সফিউশন করা যায় যদি রোগীর হিমোগ্লোবিন ঠিক থাকে এবং অন্য কোনো রক্তবাহিত অসুখ না থাকে। অটোলোগাস ট্রান্সফিউশন মানে যিনি ডোনার তিনিই গ্রহীতা।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইনস্টিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারহানা ইসলাম নীলা বলেন, দেশের শতকরা ৩৩ দশমিক ৯৭ ভাগ মানুষের রক্ত ‘ও’ গ্রুপের। ‘ও’ গ্রুপেরই ভিন্ন একটি রূপ ‘বোম্বে’ গ্রুপ। এখন রক্তের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। রক্তের সঠিক গ্রুপ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ায় ‘বোম্বে’ রক্তের গ্রুপ নিয়ে কথা হচ্ছে। যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ তাদের সঠিক গ্রুপিং হলে ‘বোম্বে’ ব্লাড গ্রুপের সংখ্যা আরও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, কারও রক্তের গ্রুপ ‘বোম্বে’ হলে সবার আগে তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ‘বোম্বে’ গ্রুপের সন্ধান করতে হবে। মা ও বাবা হিটারোজাইগাস Oh জিনের ধারক-বাহক হলে তাঁদের ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তানের রক্তও বোম্বে গ্রুপের হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের গ্রুপ কী হবে, সে বিষয়টি কারও হাতে নেই। এটা জিনগত বিষয়। অন্য সাধারণ গ্রুপের মতো বোম্বেও রক্তের একটি গ্রুপ। তবে আমাদের দেশে যাদের রক্তের গ্রুপ বোম্বে, তারা সামাজিক চাপে ও হেনস্তার কারণে গণমাধ্যমের সামনে আসতে ভয় পান।

২০১৬ সালের জুনে ‘বোম্বে’ রক্তের বিষয়টি গণমাধ্যমের আলোচনায় আসে। রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নামের এক ব্যক্তির অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের সময় রক্তের প্রয়োজন পড়ে। তখন জানা যায়, তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘বোম্বে’। রক্তের জন্য কামরুজ্জামানের অস্ত্রোপচার এক মাস থেমে ছিল। ওই বছরের ২১ মে সড়ক দুর্ঘটনায় কামরুজ্জামানের বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমর ভেঙে যায়। তখন তাঁর জন্য ‘বোম্বে’ গ্রুপের রক্ত দেশে পাওয়া যায়নি। কামরুজ্জামানের এক সহকর্মী মুম্বাইয়ের ‘থিঙ্ক ফাউন্ডেশন’ থেকে তখন তাকে রক্ত জোগাড় করে দেন।

চিকিৎসক ও রক্ত নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা বলছেন, ভারতে প্রতি ১০ হাজারে একজনের মধ্যে ‘বোম্বে’ গ্রুপের রক্ত পাওয়া যায়। সারা বিশ্বে ‘বোম্বে’ গ্রুপের রক্ত আছে, এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র ২৮ হাজার। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যানই নেই।