চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) পরিচালিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) লালদিঘী চসিক পাবলিক লাইব্রেরির সম্মেলন কক্ষে চসিক পরিচালিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আয়োজিত দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রশিক্ষণে চসিকের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬০ জন শিক্ষক অংশ নিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশনের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে বলে জানান মেয়র।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সিটি করপোরেশন বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যেই।
তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই মর্মে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার আলোকে আমরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কর্মরত প্রত্যেক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’
শিক্ষার্থীদের কাছে ক্লাসকে প্রাণবন্ত ও আনন্দময় করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, একঘেয়ে পাঠদানের পরিবর্তে গল্প, কৌতুক, গান, উদাহরণ ও বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, আনন্দময় ও কার্যকর পদ্ধতিতে শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি শিশু ঘর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার পর তার দেখভালের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর বর্তায়।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, কোনো শিক্ষার্থী অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ থাকলে, ক্লাসে অনাগ্রহ দেখালে কিংবা সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না চাইলে শিক্ষকদের বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে সমস্যার কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের অভাবে তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হতে পারে না। এ কারণে চসিকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে তার অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান মেয়র। শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ, আচরণ ও নিয়মিত পড়াশোনার বিষয়েও শিক্ষকদের খোঁজ রাখতে বলেন তিনি।
নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, একসময় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রাখতেন। এমনকি শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে শিক্ষকরা বাড়িতেও গিয়ে খোঁজ নিতেন। শিক্ষকদের এমন আন্তরিকতা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন মেয়র। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় খেলার মাঠ উন্নয়ন এবং নতুন মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাদক, কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
চসিকের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা। এ সময় চসিকের শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা বিনতে আমিনসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং
প্রশিক্ষণার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।