জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এই সরকার পুরোনো পথেই, স্বৈরাচারের পথেই হাঁটছে। অগণতান্ত্রিকভাবে তারা ক্ষমতায় থেকে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা গণভোটের গণরায় মানে নাই। তারা স্বাধীন পুলিশ কমিশন করে নাই। অর্থাৎ তারা সন্ত্রাসনির্ভর একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে চাচ্ছে, যেটা আগে ছিল সেটাকে তারা অব্যাহত রাখছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে হবিগঞ্জে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় কামাইছডা পুলিশ ক্যাম্পে সদর থানা বরাবর অভিযোগ দায়ের শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে খুবই দুঃখের সঙ্গে আমাদেরকে বলতে হচ্ছে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী যখন আমরা উদযাপন করছি, স্মরণ করছি আমাদের শহীদদেরকে এবং আমরা যে গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম, আত্মত্যাগ করেছিলাম, সে বাংলাদেশের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে, বিচারের পক্ষে আমরা কথা বলে যাচ্ছি। সেটার জন্য সারাদেশে আমাদের জুলাই পদযাত্রা চলমান ছিল, তারই অংশ হিসেবে হবিগঞ্জে এলে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে। এক কিশোরের চোখ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যেখানে শেখ হাসিনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শত শত ছেলেমেয়ের চোখ কেড়ে নিয়েছে, এই সরকার, তারেক রহমানের সরকার, এসেই পাঁচ মাসের মাথায় একজন কিশোরের চোখ কেড়ে নিল।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, যিনি স্থানীয় এমপি, যিনি একজন হুইপ, তিনি যেখানে দলকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তিনি নিজেই সন্ত্রাসী পালছেন। তার অনুসারীরা দিবালোকে এবং সন্ধ্যার সময় সকলের সামনে স্পষ্টভাবে হামলা করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, হামলার পরও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশ বলছে মামলা হয়নি। ফলে মামলা করার জন্য আমাদের বিক্ষোভ মিছিল স্থগিত করেছি। যেহেতু ১৪৪ ধারা ছিল এবং পুলিশ আমাদের অনুরোধ করেছে। কিন্তু প্রথমে তারা আমাদের মামলা করতে দেয়নি, বাধা দিয়েছে। কয়েক দফায় আমাদের ডা. মাহমুদার গায়ে হাত তুলেছে পুলিশ। তারপরও আমরা বলেছি, মামলা না নিয়ে আমরা মাঠ ছাড়বো না, হবিগঞ্জ ছাড়বো না। প্রয়োজনে আমাদের লাশ পড়ে থাকবে, কিন্তু মামলা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। পরে পুলিশ আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে এসে অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং দুই ঘণ্টার মধ্যে মামলার কপি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বিএনপি ও স্থানীয় নেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আপনারা দেখছেন, স্থানীয় এমপি এবং বিএনপির সন্ত্রাসী বাহিনী কীভাবে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে। গত ১৬ বছর যখন বালুর ট্রাক দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবন আটকে রাখা হয়েছিল, তখন তাদের এই সাহস কোথায় ছিল? আজকে তারাই ট্রাক বসিয়েছে।
নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে কটূক্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী অথবা আমাদের দলের যে কেউ যদি প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে কোনো বক্তব্য দেন, আইন অনুযায়ী তার ব্যবস্থা হবে। তিনি যদি রাজনৈতিক মূল্যবোধবিরোধী কোনো বক্তব্য দেন, তার বিচার জনগণ করবে, ভোটে রায় দেবে। কিন্তু ছাত্রদল, বিএনপি বা কোনো সন্ত্রাসীর সেই বিচার করার এখতিয়ার নেই।
তিনি আরও বলেন, যে সাবেক রাষ্ট্রপতি, যে ফ্যাসিস্ট চুপ্পু, তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন। যদি তাদের সাহস থাকে, তাহলে তারা চুপ্পুর বিরুদ্ধে কথা বলুক, তাকে গ্রেপ্তার করুক। সেই হিম্মত কিন্তু এই সরকারের নেই।
নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা গণঅভ্যুত্থানের কর্মী। নতুন রাজনৈতিক দল করেছি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য কাজ করছি। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেই তো আমাদের লড়াই ছিল। আমরা চেয়েছিলাম পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
হবিগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জি কে গউছ সন্ত্রাসী ছিলেন বা সন্ত্রাসী পোষেন, সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেন— এটা হবিগঞ্জের মানুষ জানতো। গতকাল পুরো বাংলাদেশ জেনেছে, আজকে পুরো পৃথিবী জেনেছে। এই সরকার কীভাবে বিরোধীদলের সঙ্গে আচরণ করে, কীভাবে মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করছে, সেটাই আজ প্রমাণিত হয়েছে।
পুলিশের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ যদি তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে চায়, শেখ হাসিনার সময়ের দলীয়করণের ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়- তাহলে এই ঘটনার যথাযথ বিচার করতে হবে। আজ রাতের মধ্যেই আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হবে, যাতে তারা পালিয়ে যেতে না পারে। তাদের বিচার হলে আমরা অন্তত ধরে নেব, কিছুটা হলেও এখানে ন্যায়বিচার আছে। আর না হলে আমরা ধরে নেব, দেশ আবারও একটি মাফিয়া ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
এ সময় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় নারী শক্তির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।