“মা করেছে রান্না খেলাধুলা আর না
চল গিয়ে দেখি মা রাধছে কি?”
ঝটপট সকল প্রকার নুডলস রান্না মায়ের দায়িত্ব, হোক সেটা দুই মিনিটের পরিশ্রম। সামান্য নুডলস ই,এটুকুর জন্য কি পুরুষের সাহায্য লাগবে বলুন? কী মেয়ে!সামান্য নুডলস রান্নার বিজ্ঞাপনে ভুল ধরতে এসেছি? রান্না মায়ের আবেগ, যত্ন।এতে আমার কর্মজীবী মায়ের দিনশেষে ফিরে সন্ধ্যা বেলার বিশ্রাম হলেই কি নাহলেই কি!

“বাসায় করলে কি আর রেস্টুরেন্টের স্বাদ আনা যায়?”স্যুপ রেস্টুরেন্টের মত হয় না বলে কী আফসোস, এটা আবার পাশের বাড়ির ভাবি এসে বলে,” বাসায় বানাও না কেন? ” নিজে তো রান্নাঘরে নিজের জীবন অধ্যবসায় করছেই সাথে পাশের বাসার ভাবিকেও সেরা রাধুনি হওয়ার পথ দেখাচ্ছে।আহা কত মানবপ্রেম!কত শেখানোর চেষ্টা। হোক না সেটা নারীকে বেধে রাখার শিক্ষা, ‘পারফেক্ট’ হতে হবে তো!

তো এই এত যে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ,মিষ্টিজাতীয় খাবার খাইয়ে ডাকাতদের মন ভুলিয়ে দেওয়া(ডিপ্লোমা ডেজার্ট), বউমা হয়ে বাড়ির সবার জন্য আলাদা আলাদা পছন্দের রান্না করে পারফেক্ট রাধুনি হওয়া, খাঁটি সরিষার তেলের ভর্তা (রাধুনি খাঁটি সরিষার তেল) থেকে শুরু উপমহাদেশীয় এবং থাই রান্নাতে এসব রাঁধুনিরা কিন্তু নর শেফ কিংবা ফরচুন বাসমতি রাইস বিজ্ঞাপনের ‘শেফ’ হতে পারেনি। সুন্দর না?

নারীর দৌড় তো রান্নাঘর পর্যন্তই তাই না?নারীরা ইনোভেটিভ রেসিপি পারে না। সকল বড় শেফের নাম তো পুরুষের। তবে হ্যাঁ,এখানে কিন্তু নারীবাদীরা এটা বলবেন, যে নারীদের বাইরে রান্নার সুযোগ দেওয়া হয় না, নারীর দক্ষতা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মের স্বাধীনতা নাই। রাখুন তো এসব,সব জায়গায় নারীবাদী হলে চলে?বউ বাইরে রেস্টুরেন্টে রান্না করলে মান সম্মান থাকবে?বাচ্চা কে মানুষ করবে? আপনারা বেশ বিদ্রোহী কথা বলেন।এভাবে সংসার চলবে?

ডেটলে জীবাণুমুক্ত রাখার সব দায়িত্ব মায়ের,৯৯.৯% সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মায়ের ১০০% জীবন এবং শখ বিসর্জন দিতে হলেই কি আর এমন আসে যায়?

আর ডেটল শুধু ছেলেদের প্রয়োজন হয় কারণ খেলাধুলা শুধু ছেলেদের।মেয়েরা তো খেলতে যেতেই পারে না,কীভাবে জীবাণু স্পর্শ করবে বলুন? মেয়েরা এশিয়া কাপ জিতলেই কি, মাঠে তো মেয়েদের ক্লান্ত লাগে না,তাই তাদের গ্ল্যাক্সোজ ডি প্রয়োজন নাই। তবে ফ্রেশ লুক দিতে বা সারাদিন ফ্রেশ রাখতে রিভাইভ পাউডার এর আরেকটা বিজ্ঞাপন করলে মন্দ হয় না। আর তাছাড়া এত রোদে খেলে, সেক্ষেত্রে গার্নিয়ার স্পিড হোয়াইট ব্যবহারের বিজ্ঞাপন কররে হবে যাতে নারী ক্রিকেটাররা দুই সপ্তাহেই ফর্সা হতে পারে!

ভুলেই গিয়েছি নারী ক্রিকেটাররা অনেক ঘাম ঝরিয়ে থাকেন। নির্মাতাদের মতে আন্ডারয়ার্ম শুধু নারীর হয়, তাই সেটা কালো হলে মুখ দেখানো যাবে বলুন?ডিও, হোয়াইটেনিং স্প্রে বিজ্ঞাপন এর নতুন আইডিয়া আমদানি করতে পারেন।
লোমহীন হাত পা ছাড়া নাকি পারফেক্ট লুক হয় না।তো ক্রিকেট খেলেই কি জীবন চলবে নাকি?পারফেক্ট লুক আনতে সেসব তো তুলতে হবে। অবশ্য লোম শুধু মেয়েদের হয়, নির্মাতাদের মতে ছেলেদের হয় না!

রোশনী থেকে ডাক্তার রোশনী বানাতে হরলিক্স দিতে হবে মা কে।আসলেই তো! বাবার কাজ বাইরের কাজ,অনেক কঠিন কাজ।সন্তানের দেখাশোনা শুধু মায়ের!হোক সেটা নিম্নবিত্ত পরিবারের কোনো মেয়ের ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা কিংবা কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের নিউট্রিশন নিশ্চিত করতে পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হওয়ার (পেডিয়াশিওর) বিজ্ঞাপন।

“এক সাবানে কাপড় কাচা সেই সাবানে গোসল” দিতে কেয়া লন্ড্রি সোপ থেকে শুরু করে “পোরাপ্পো” কিংবা দশ টাকার সার্ফ এক্সেল এবং ওয়াশিংমেশিন ব্যবহারের দায়িত্ব মা-দাদিদের।ক্যামেরা পিক্সেল বাড়ানো ছাড়া বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের আর কী দায়িত্ব বলেন?পুকুর থেকে ওয়াশিং মেশিন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জেন্ডার ভিত্তিক অগ্রগতি নয়।এসব রসহীন ব্যাপার বলতে আছে নাকি?

“অবাক লাগছে?” আরে না আপনাকে অবাক হতে বলি নি,টাইড প্লাসের বিজ্ঞাপন এর কথা বলছি। কিংবা “আগে ব্যবহার করুন তারপর বিশ্বাস করুন” এ ঘড়ি ওয়াশিং পাউডারগুলোতে নারীরাই কাপড় পরিষ্কার করে। কী প্রতিভা নারীর! আর খেয়াল করেছেন, এসব বিজ্ঞাপনে পুরুষেরা যেসব পোশাক পরে সেসব পরিষ্কার করে নারী,।’উজালা’ দিয়ে পুরুষের পোশাকের শুভ্রতা বাড়াতে নারীর তুলনা হয় না। সম্ভবত নারীর পোশাক নোংরা হয় না। হলে তো বিজ্ঞাপনে দেখাতো তাই না? আর তাছাড়া নিজের কাজ নিজে করতে হয় না। দেখছেন কত যত্ন করে নারী স্বামীর শার্ট ধুয়ে দেয়, এটা নিয়ে আবার অন্য নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা হয়। কাপড় যার যত পরিষ্কার করার ক্ষমতা সেই গৃহিণী তত চৌকস(স্মার্ট)। আহা! কী দারুণ মাপকাঠি।

চাকরিতে পড়াশোনার দক্ষতা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় না যদি না আপনার উজ্জ্বল ত্বক থাকে।আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ফেয়ার এন্ড লাভলী(পরিবর্তিত নাম গ্লো এন্ড লাভলি) বেশ কার্যকর। তারা নারীর আত্মবিশ্বাস এর কৌশল বলেছে।

আমরা এটা স্বীকার করতে বাধ্য যে, বাণিজ্য সম্প্রসারণের এবং অর্থনীতি সচল রাখতে বিজ্ঞাপন (মিডিয়ার অন্তর্গত) একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। আধুনিক যুগে মিডিয়া একটি শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এটা ভুললে চলবে না। বিজ্ঞাপন নির্মাতা বা আরো যত বিষয় মিডিয়ার অন্তর্ভুক্ত সেসবের নির্মাতারা সচেতন না হলে তা এড়িয়ে যাবে। বর্তমানে যা অবস্থা তাতে এধরণের কাল্পনিক উপস্থাপন এত বেশি প্রভাব রেখেছে সমাজে যে, মানুষ তার শারীরিক গঠন পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করে না। তাই মিডিয়া প্রভাব লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে, ব্যাপারটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ থাকে না।

লেখক:মোহনা হক
শিক্ষার্থী:উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।