আগামী ১ জুলাই থেকে জানা যাবে কোন মোবাইল ফোনগুলো বৈধ, আর কোনগুলো অবৈধ। অবৈধ মোবাইল ফোন চিহ্নিত করে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হলে দেশে কোনও অবৈধ মোবাইল ফোন থাকবে না। দেশের বাইরে থেকে অবৈধ চ্যানেলের (গ্রে মার্কেট) মাধ্যমে দেশে আসা ফোনও চালু হবে না। এতে করে অবৈধ পথে দেশে মোবাইল ফোন আসা বন্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবহারকারীর হাতের মোবাইল ফোনটা বৈধ না অবৈধ তা জানার জন্য একটি সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) নামের এই সিস্টেমটি আগামী ১ জুলাই চালু হবে। এই সিস্টেমটি মোবাইল ফোন অপারেটর ও আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ফোন আইডেন্টিটি নম্বর) ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে চালু থাকা মোবাইল নম্বর ও হ্যান্ডসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়ে যাবে। এরই মধ্যে চালু হওয়া আইএমইআই ডাটাবেজে ১৪ কোটি আইএমইআই নম্বর যুক্ত হয়েছে। সাত কোটি মোবাইল সেটের তথ্যও যোগ করা হয়েছে। সিস্টেমটি চালু হলে সেসব মোবাইল নিবন্ধিত হয়ে যাবে। আর ৩০ জুনের পরে যেসব মোবাইল নিয়ম মেনে দেশে ঢুকবে না, সেগুলো সচল হবে প্রক্রিয়া মেনে।

প্রসঙ্গত, এনইআইআর সিস্টেম চালুর জন্য বিটিআরসি সিনেসিস আইটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বিটিআরসি সিনেসিস আইটির কাছ থেকে এই সেবা নেবে। গত নভেম্বর মাসে বিটিআরসি সিনেসিস আইটির সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়।

জানা গেছে, রবিবার (১৩ জুন) বিটিআরসিতে এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিষয়ে অগ্রগতি, সংশোধন, আরও সহজ কোনও প্রযুক্তি চালু করা যায় কিনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিটিআরসির কমিশনাররাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সিনেসিস আইটি কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রেজেন্টেশনও দিয়েছে। প্রেজেন্টেশনের কিছু বিষয় সংযোজন বিয়োজন নিয়েও আলাপ হয় বলে বৈঠকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বিটিআরসি ব্যাপক প্রচারণা চালাবে। অন্যান্য প্রচারণার পাশাপাশি বিটিআরসি ১ লাখ কপি প্রচারপত্র ছাপাবে। এর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি প্রচারপত্র উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পাঠিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হবে যাতে করে কেউ অবৈধ মাধ্যমে দেশে আসা মোবাইল ফোন না কেনেন বা ব্যবহার করেন।

কোন মোবাইল বৈধ?

আগামী ৩০ জুনের মধ্যে যেসব ফোন চালু থাকবে সেগুলোকে বৈধ বলে ধরে নেওয়া হবে। ফোন চালু হলে সেগুলো ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেগুলো নিবন্ধিত হয়ে যাবে। ৩০ জুনের মধ্যে পরে বৈধ পথে আসা ফোনগুলো কেনার সময়েই নিবন্ধন করা যাবে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে মোবাইল ফোন কেনার সময় কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে মোবাইলটি সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন করা যাবে। সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার থেকেও ফোন নিবন্ধন করা যাবে। ধরা যাক, ৩০ জুনের মধ্যে ফোনটি দেশে এসেছে কিন্তু তা চালু করা হয়নি। তা ১ জুলাই বা তার পরবর্তী সময়ে চালু করতে গেলে নিবন্ধন করে এবং এনআইডি ডাটাবেজের সঙ্গে যাচাই করে চালু করা যাবে। তবে অবৈধ পথে (লাগেজে করে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ফোন) আনা কোনও মোবাইল ফোন চালু করা যাবে না। ডাটাবেজ সেটটি চালুর বিষয়ে সবুজ সংকেত দেবে না। মোদ্দা কথা, চোরাই পথে আসা মোবাইল ফোন চালু করা যাবে না।

বিদেশ থেকে আনা ফোনের কী হবে?

নিয়ম মেনে বিদেশ থেকে ফোন আনলে তা নিবন্ধন করে চালু করা যাবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে ৮টি মোবাইল ফোন আনা যায়। এর আগে নিয়ম ছিল সর্বোচ্চ ৫টি মোবাইল ফোন আনা যাবে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম কার্যকর রয়েছে। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি একটি পরিপত্র জারি করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরে পাঠায়। এতে উল্লেখ ছিল, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট আমদানির সংখ্যা ৫টির পরিবর্তে ৮টি করা হয়েছে। প্রত্যেক যাত্রী প্রতিটি বোর্ডিং পাস বা সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজ অনুযায়ী বিটিআরসি’র অনাপত্তিপত্র ছাড়া ৮টি মোবাইল ফোন নিয়ে আসতে পারবেন। তবে এসব মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের মধ্যে সর্বোচ্চ দুটি আনা যাবে বিনা শুল্কে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে কাস্টমস সংশ্লিষ্ট আইন প্রযোজ্য হবে।

বিদেশ থেকে সেট আনলে পাসপোর্ট, ভিসার কপি, পণ্য ক্রয়ের রশিদ ইত্যাদি দেখিয়ে এ বিষয়ে তৈরি করা ওয়েবসাইটে গিয়ে ফোনটি নিবন্ধন করা যাবে। উপহার পেলে তার পক্ষেও প্রমাণপত্র থাকতে হবে। তবে ফোনটি যদি ক্লোন হয় বা আইএমইআই নম্বর যদি নকল হয় তাহলে ফোনটি চালু হবে না।

নিবন্ধনের পদ্ধতি

যেসব মোবাইল নম্বর চালু আছে বা ৩০ জুনের আগে চালু হবে সেগুলোর বিষয়ে গ্রাহককে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে চালু করতে হলে গ্রাহককে উদ্যোগী হতে হবে। এজন্য বিটিআরসি একটি ওয়েবসাইট চালু করবে। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফোন নিবন্ধন করা যাবে। এছাড়া নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ করার জন্য একটি সহজ অ্যাপ চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে বিটিআরসির। অ্যাপের মাধ্যমে সহজ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করেও (বিকাশ বা নগদে নিবন্ধন করার মতো) নিবন্ধন করা যাবে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, যেসব মোবাইল অবৈধ বলে চিহ্নিত হবে সেগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হবে না। তাদেরকে পুননিবন্ধন (রি-রেজিস্ট্রেশন) করার সুযোগ দেওয়া হবে। সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হবে। এই সুযোগ নিয়েও যারা তাদের ফোন নিবন্ধন করাবেন না তাদের ফোন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালের ১ আগস্টের আগে মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে চালু এবং ওই সময়ের পরে বৈধ পথে আমদানি, দেশে তৈরি মোবাইল ফোনের তথ্য বিটিআরসির কাছে সংরক্ষিত থাকবে। এর বাইরেরগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১ জুলাই এনইআইআর সিস্টেমটি চালু হবে কিনা এবং কাজের অগ্রগতি জানতে চেয়ে সিনেসিস আইটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো বিভাগের প্রধান আমিনুল বারী শুভ্র বলেন, কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক।

মোবাইল ফোন উৎপাদক ও আমদানিকারকদের সংগঠন বিএমপিআইএ’র তথ্য অনুযায়ী দেশে উৎপাদিত মোট চাহিদার ৮২ শতাংশ সেট দেশেই তৈরি হয়। অবশিষ্ট ১৮ শতাংশ ফোন বৈধপথে আমদানি করা হয়। এর বাইরে রয়েছে গ্রে মার্কেট (অবৈধ ফোনের বাজার)। এই মার্কেটের আকার দেশে বিক্রি হওয়া মোট মোবাইলের ২৫-৩০ শতাংশ, সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ৭৫ লাখ থেকে ১ কোটি ইউনিট হ্যান্ডসেট। প্রতিবছর সরকার এই পরিমাণ হ্যান্ডসেটের রাজস্ব হারায়। এনইআইআর সিস্টেম চালু হলে যা সম্ভব হবে না।

মোবাইল বৈধ না অবৈধ যাচাইয়ের পদ্ধতি

মোবাইল ফোন বৈধ না অবৈধ তা দেখেতে সঠিক আইএমইআই যাচাই পদ্ধতি রয়েছে। এজন্য একটা ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যাকে ডাকা হচ্ছে এনইআইআর নামে। মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে KYD টাইপ করে স্পেস দিয়ে মোবাইলের ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর লিখে সেটি ১৬০০২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি এসএমএসে আইএমইআই নম্বরটি বিটিআরসির ডাটাবেজে সংরক্ষিত আছে কিনা তা জানা যাবে। ফিরতি মেসেজে ডাটাবেজে সংরক্ষণের তথ্য থাকলে সেটি হবে বৈধ ফোন।