ছয় দফা ছিল বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব ভাবনার ফসল তৎকালীন আওয়ামী লীগের নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রোফেশনালস (বিইউপি) এর বঙ্গবন্ধু চেয়ার প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

আজ মঙ্গলবার (০৮ জুন) সকালে ঐতিহাসিক ছয়-দফা দিবস উপলক্ষে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তবে তিনি বলেন, “ছয় দফা নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে  লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে সম্মিলিত বিরোধী দলের একটি সভা হওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী লীগ সেখানে আমন্ত্রণ পায়। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সেখানে কাউকে না পাঠিয়ে শেখ মুজিবকে যেতে পরামর্শ দেন এবং সাথে কিছু নোট টুকে নিতে বলেন। আওয়ামী লীগের কেউ জানতো না ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু এই প্রস্তাব করবেন। ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলেন। ১৮-২০ মার্চ আওয়ামী লীগের প্রথম ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ, আবদুস সালাম খান ছয় দফার বিরোধিতা করেছিলেন।”

ছয় দফার প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, “লাহোর প্রস্তাব, রোজ গার্ডেনে দল গঠন, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পরামর্শে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বৈঠক, আগরতলায় গোপন বৈঠক, ১৯৬৫ সালের আওয়ামী লীগের ১১ দফা তথা ১৯৪০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার ফসল এই ছয় দফা। যেটিকে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।” তিনি আরো বলেন, “একবার আবদুর রাজ্জাক প্রশ্ন করেছিলেন শেখ মুজিবকে যে, আমরা চাই স্বাধীনতা কিন্তু ছয় দফায় তো শুধু স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হচ্ছে। উত্তরে মুজিব বলেছিলেন, তোমাদের ওখানে যাওয়ার সাঁকো করে দিলাম। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ছিল এই ছয় দফা।”

এই বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বলেন, “১৯৬৭ সালে ছয় দফা থেকে সরে আসতে প্রথমে অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়েছে পরে প্রলোভন দেখানে হয়েছে। কিন্তু বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিবের দৃঢ়তায় সেখান থেকে মুজিবকে সরানো সম্ভব হয়নি।”

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “ছয় দফা দিবস নিয়ে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনার আয়োজন করেছে বলে আমার জানা নেই। তাই নব-নিযুক্ত উপাচার্য ও প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন আয়োজন করার ধন্যবাদ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক প্রফেসর ড. মেসবাহ কামাল সভাপতির বক্তব্যে বলেন, “বঙ্গবন্ধু আগরতলায় গিয়েছিলেন এটিই বাস্তবতা। লক্ষ ছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রতিবেশি ভারতের সমর্থন। রাজনৈতিক বিবেচনায় যা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু আগরতলায় মাত্র একটি রাত ছিলেন এবং ত্রিপুরা সরকার তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সংঙ্কিত ছিল। কারণ পাকিস্তানি গুপ্তচররা ঐ দিকেও ছিল। নিরাপত্তার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ঐ একরাত আগরতলায় জেলখানায় রাখা হয়েছিল। সুতরাং আগরতলা কোনো ষড়যন্ত্র মামলা নয়, এটি সত্য মামলা। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষেই আগরতলা গিয়েছিলেন।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান জনাব নজরুল ইসলাম, সদস্য জনাব নূরুল ইসলাম মোল্লা ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. শওকত আরা হোসেন।

এরআগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. ইফফাত জাহান, এবং সমাপনী বক্তব্য ও অতিথিদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মো. রায়হান আজাদ।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ডিন, বিভাগীয় প্রধানগণ, শিক্ষকবৃন্দ, ছাত্রছাত্রী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ফেইজবুক পেইজে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীরা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।