মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গুলিতে নিহত তরুণীর শেষকৃত্যে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। দেশটির রাজধানীতে রোববার (২১ ফেব্রুয়ারি) শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।

এর আগে মায়া থ্যা থ্যা খাইং ১৯ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ চলাকালীন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আর কিছুদিন পরই তার ২০তম জন্মদিন ছিল।

রোববার (২১ ফেব্রুয়ারি) হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নিহত ওই তরুণীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এদিন সমবেত জনতার একাংশ তিন আঙুলের সালাম ঠুকে সম্মান জানান। বিক্ষোভকারীরা অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনে এই প্রতীক ব্যবহার করে আসছে।

চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। প্রথমদিকে আগাম নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিক্ষোভকারীরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বিক্ষোভকারীদের দাবি, দেশটির নির্বাচিত নেতা অং সান সু চি এবং তার জাতীয় লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দলের অন্যান্য সদস্যদের যেন মুক্তি দেওয়া হয়।

মায়ার মৃত্যুই মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে এটাই কোনো মৃত্যুর ঘটনা। গেল সপ্তাহে জলকামান, রাবার বুলেট এবং গুলি চালিয়ে পুলিশ যখন বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করছিল তখন মায়া থ্যা থ্যা খাইং আহত হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পুলিশের গুলিতে মায়া আহত হন।

এর আগে একজন চিকিৎসক ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আমরা বিচার চাই। বিচারের জন্য লড়াই চলবে। তিনি আরও বলেন, আহত মায়াকে হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়ার পর থেকে তাদের নানা ধরনের চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মায়া ২০ বছরে পা রাখেন। ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

বিবিসি বার্মিসকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, মায়াকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তার মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল।

মায়া এবং তার পুরো পরিবার অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সমর্থক। তার ভাই জানান, নভেম্বরে তিনি প্রথমবারের মতো ভোট দেন। ওই নির্বাচনে এনএলডি জয় পায়।

মায়া থ্যা থ্যা খাইংয়ের মৃত্যুর পর সংক্তিপ্ত বক্তব্যে তার বোন মায়া থ্যা থ্যা খাইং এনইউ সাংবাদিকদের শুক্রবার বলেন, বর্তমান শাসকের হাত থেকে মুক্তির জন্য বিক্ষোভে অংশ নিতে সব নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

এসবের মূলে কী?

সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দেশটির নভেম্বরের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায়। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

সেনাবাহিনীর দাবি, এনএলডি জালিয়াতি করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, নির্বাচনে কারচুপির কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু সামরিক বাহিনী জালিয়াতি করা ভোট ফেরত দেয়ার দাবি জানায়।

বর্তমানে দেশটির কমান্ডার ইন চিফ মিং অং হ্ল্যাং ক্ষমতায় আছেন। সু চি গৃহবন্দি।

প্রথমে সু চির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ওয়াকিটকি ব্যবহারের অভিযোগে মামলা হয়। পরে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ভঙ্গের দায়ে দ্বিতীয় দফায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সর্বশেষ মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

বিক্ষোভকারীরা সু চিসহ এনএলডির শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন। অভ্যুত্থানবিরোধী চলমান বিক্ষোভকে দেশটিতে ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত কথিত জাফরান বিপ্লবের চেয়ে বৃহৎ বলে আখ্যা দেয়া হচ্ছে।

চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। আন্দোলন দমাতে ইন্টারনেট পরিষেবার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে যাচ্ছে জান্তা সরকার।

মিয়ানমারের মূল পরিচয়

মিয়ানমার বার্মা নামেও পরিচিত। ১৯৬২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশটি সামরিক বাহিনীর কঠোর শাসনে থাকায় একে জাতিবিচ্যুত রাষ্ট্র বলেও দীর্ঘদিন অভিহিত করা হয়। ২০১০ সালে সামরিক শাসন থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৫ সালে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির জ্যেষ্ঠ গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সরকার গঠন হয়।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ নৃশংসতা চালায়। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে পাঠ্যপুস্তকে উল্লিখিত গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে জাতিসংঘ।

নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডি বিশাল জয় পাওয়ায় ১ ফেব্রুয়ারি সু চির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনী।