বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর – জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শতবছর আগেই নারীদের স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনো বলে যাচ্ছে, মেয়ে হয়ে জন্মেছ এটা কর, ওটা কর না, মেয়েদের এটা উচিত না,সেটা ভালো না, এই সেই। কিন্তু কিছু কিছু মেয়েরা সমাজের এ নিয়ম মেনে নেন নি। স্রোতের বিপরীতে গা ভাসিয়ে তারা বেছে নিয়েছেন প্রতিকূলতার পথ। প্রমাণ করে দিয়েছেন শুধু মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার জন্যই নারীর জন্ম হয়নি।

এমনই এক অসাধারণ নারী হলেন সাকিয়া হক। অবশ্য স্কুটিতে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করে ইতিমধ্যেই সারাদেশে ভ্রমণকন্যা নামে পরিচিত হয়েছেন তিনি। মেয়েদের ভ্রমণ সংগঠন ‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ-ভ্রমণকন্যা’ এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হলেন সাকিয়া।

সাকিয়ার জন্ম এবং বেড়ে উঠা খুলনাতেই। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেছেন তিনি। শুরু থেকেই পড়াশোনার প্রতি খুব মনযোগী ও যত্নশীল ছিলেন তিনি। তাই দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়ে যান। তখন থেকেই স্বপ্ন ছিল তিনি স্বাবলম্বী হয়ে সমাজের জন্য নতুন কিছু করবেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ভলিন্টিয়ার হিসেবে কাজ করেন, তারপর টিওশনি এবং কোচিং সেন্টারেও ক্লাস নিতে থাকেন নিয়মিত। পুরো দেশ ভ্রমণের কথা হয়তো তখন এতটাও ভাবেন নি।

ঢাকা মেডিকেলে পড়াকালীন ভাইভা পরিক্ষা দিচ্ছিলেন সাকিয়া হক। এমন সময় এলাকাভিত্তিক একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যার্থ হওয়ায় ম্যামের কথা শুনতে হয় তাকে।
তাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন একদিন এই দেশের সব জেলা তিনি ঘুরে ঘুরে দেখবেন। সকলের সংস্কৃতির কথা জানবেন। কিন্তু চাইলেই তো আর পাওয়া যায়না। সেজন্য চেষ্টা করতে হয়। কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই একটা উপায় বাতলে ফেললেন। বান্ধবী ডা. মানসী সাহার সাথে স্কুটিতে করেই সমগ্র দেশ ভ্রমণ করবেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল শুরু করেন ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’ নামক ভ্রমণ অভিযান।

এই যাত্রা যে শুধুই দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন আর সংস্কৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান লাভের জন্য ছিল ঠিক তা নয়। সেই সাথে ছিল একটি মহৎ উদ্দেশ্যও। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে মেয়েদের স্কুলে গিয়েছেন তারা আর আয়োজন করেছেন সমাজ সচেতনতামূলক বিভিন্ন সেমিনারের। কথা বলেছেন মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল, বয়ঃসন্ধিকালের যত্ন,বাল্যবিবাহের প্রভাব, ইভটিজিং সহ নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।

উদ্দেশ্যগুলো অসাধারণ হলেও শুরুর দিকে খুব একটা মসৃণ ছিল না তাদের এই পথচলা। নানান নেতিবাচকতা,কটুক্তি, রাস্তার আপদ বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। পরবর্তীতে প্রশাসন, পুলিশ আর সাধারণ মানুষের সহায়তায় দীর্ঘ ২ বছরে সম্পন্ন করেন ৬৪ জেলা ভ্রমণ।

কথায় আছে ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। সমগ্র দেশ ভ্রমণ করেও পড়াশোনার দিক দিয়ে মোটেও পিছিয়ে পড়েন নি সাকিয়া হক। ৩৯ তম বিসিএস পরিক্ষা দিয়ে ক্যাডারও হয়েছেন তিনি। বর্তমানে কক্সবাজারে কর্মরত আছেন।

গল্পের এখানেই শেষ নয়। এই যে সাকিয়া হক এতকিছু করলেন এর জন্য কোনো স্বীকৃতি ই পাবেন না তা কি হয়? দেশীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি স্বপ্নবাজ এই তরুণীর প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সম্মাননা। সমাজব্যবস্থার অগ্রগতিতে অসাধারণ ভূমিকা পালনের জন্য সম্প্রতি প্রিন্সেস ডায়না এওয়ার্ড ও পেয়েছেন তিনি। নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছা করছে এতসব সাফল্যের পিছনের রহস্যটা কি? সাকিয়া হক মনে করেন মায়ের স্নেহভরা শাসন আর মুক্তিযোদ্ধা বাবার কাছ থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণাগুলোই সাফল্যের মূল কারণ।

আমাদের দেশের তরুণ স্বপ্নবাজদের কাছে সাকিয়া হক এখন এক বিশাল অনুপ্রেরণার নাম। অনলাইন থেকে অফলাইন অনেকেই ফলো করছেন তাকে, অনেকেই নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখছেন। সাকিয়া হক প্রমাণ করে দিয়েছেন,মনের ইচ্ছা আর সবকিছু মোকাবিলা করার সাহস থাকলে মেয়েরাও করে ফেলতে পারেন অসাধারণ সব কর্মকাণ্ড,অবদান রাখতে পারেন সব জায়গায়। মেয়ে হয়ে জন্মেছেন বলেই যে বড় কিছু করা যাবে না এমনটা ভাববেন না। সবসময় মনে রাখবেন, ‘না’ থেকে নারীর শক্তি অনেক বেশি।