বাংলা অভিধানে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো আকারে ছোট হলেও গভীরতা অনেক।এমনই একটি শব্দ হল ‘বন্ধু’।বন্ধু কাকে বলে বা বন্ধু মানে আসলে ঠিক কি – এ কথা জিজ্ঞাসা করলে স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন রকম উত্তর আসবে।কেউ কেউ বলেন,বন্ধু তো বন্ধুই।কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি দিয়ে বন্ধুকে মাপা যায় না।ঠিক তাই ই।বন্ধু মানে এমন একজন যাকে নির্দ্বিধায় মনের সব কথা বলা যায়,যার সাথে নিজের কষ্ট ভাগ করা যায়,যে পাশে থাকলে পৃথিবী জয়ের সাহস পাওয়া যায়।

ইতিহাস সাক্ষী অসাধারণ কিছু বন্ধুত্বের। একজন সত্যিকারের বন্ধু কখনোই তার বন্ধুকে ছেড়ে যায়না।সুখে-দুঃখে,আপদে -বিপদে সবসময়ই ছায়ার মত পাশে থাকে।কোরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মদিনায় হিজরত করেন,তখন নিজের জীবন বাজি রেখে নবীজীর হিজরত সঙ্গী হন আবু বকর(রাঃ)।যিনি ছিলেন নবীজীর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।

১ লা জুলাই,২০১৬ এর কথা আমাদের সবারই জানা।যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে।গুলশানের হোলি আর্টিজেনে সেদিন ঘটেছিল নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।ফারাজ আইয়াজ হোসেন নামক তরুণের কাছে সুযোগ ছিল পালিয়ে বাঁচার।কিন্তু বন্ধুদের একা ফেলে নিজের জীবন বাঁচাতে রাজি হন নি ফারাজ।বন্ধুদের সাথে নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন তিনি।তাঁর এই সাহসিকতা আর বন্ধুত্ব সারা বিশ্বের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরদিন।

সব সম্পর্কের সেরা সম্পর্ক হলো বন্ধুত্ব।
কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ কে একবার বন্ধুত্ব আর প্রেমের মধ্যে কোনটির মূল্য বেশি বলে প্রশ্ন করা করা হলে তিনি জবাব দেন,’প্রেম হল সোনার মত।যা ভেঙে গেলে আবার নতুন করে গড়া যায়,কিন্তু বন্ধুত্ব হল হীরার মত।যা একবার ভেঙে গেলে আর গড়া যায়না।অবশ্যই বন্ধুত্ব বেশি মূল্যবান।’এই সুরে সুর মিলিয়েছেন নামী দামী অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গও!প্রেমের লেখক হয়েও উইলিয়াম শেক্সপীয়ার গেয়েছেন বন্ধুত্বের জয়গান।কাউকে সারাজীবনের জন্য কাছে পেতে হলে তাকে প্রেম দিয়ে নয়,বরং বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখার কথা বলেছেন তিনি।আর কারণ হিসেবে বলেছেন,’প্রেম একসময় হারিয়ে যায় কিন্তু বন্ধু কখনোই হারায় না।’

অনেকেই আবার মনে করেন সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যায় অনেক সম্পর্কই।কিন্তু বন্ধুত্ব হল এমন এক তেতুল,এটা যতই পুরাতন হয় এর আয়ুর্বেদ ক্ষমতা ততই বাড়ে।ভার্চুয়াল জগতের অসংখ্য মানুষের ভীড়ে নতুন সবকিছু উৎকৃষ্ট মনে হলেও,পুরাতন বন্ধুত্ব থেকে যায় উৎকৃষ্টতরের তালিকায়!

জীবনের কিছু ক্ষেত্রে আর কাউকে না পেলেও বন্ধুদের পাওয়া যায়।যেমন ধরুন আপনি একটা নতুন কিছু শুরু করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বাধা আসছে,নানান কথা বলছে মানুষ।আপনি খুব হতাশ হয়ে ভেঙে পড়েছেন।এমন সময় ভরসার হাত বাড়িয়ে দেন একজন প্রকৃত বন্ধুই।আপনার বন্ধু যখন বলে, ‘দোস্ত আমি জানি এটা তুই না পারলে আর কেও পারবে না।’ব্যস! নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কি এইটুকুই যথেষ্ট নয়?দুঃসময়ে যখন কেও আমাদের ব্যাথা বুঝতে চায়না,তখনও সত্যিকারের বন্ধু আমাদের পাশে থাকেন। জীবনের এই দুঃসময়গুলোতে বন্ধুদের অবদান এর কথা ভেবেই হয়তো গায়ক তপু গেয়েছেন,”তোরা ছিলি,তোরা আছিস জানি তোরাই থাকবি…বন্ধু…বোঝে আমাকে।”

বন্ধু মানে একই সুরে গান, বন্ধু মানে অকারণ মান অভিমান।বন্ধু মানে হতাশার সাগরে একটুখানি আশা,বন্ধু মানে এক বুক ভালোবাসা।দিনশেষে কিন্তু বন্ধুরাই থেকে যায়।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বন্ধুর অবদান এবং বন্ধুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বন্ধু দিবস।বন্ধু দিবস পালন নিয়ে বিভিন্ন মতামত থাকলেও দিনটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।১৯৩৫ সালে আমেরিকার সরকার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। দিনটা ছিল আগস্ট মাসের প্রথম শনিবার। এই ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রোববার ওই নিহত ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করেন।সেই থেকে আগস্ট মাসের ১ম রবিবার বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হয় অনেক দেশেই।

বন্ধু যে শুধুই সহপাঠী অথবা সমবয়সী হতে হবে এমন কিন্তু না।যে কোনো বয়সের মানুষের সাথেই গড়ে উঠতে পারে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।দুনিয়ার সবথেকে সুন্দর সম্পর্ক হল বন্ধুত্ব। আর এই বন্ধুত্ব হতে পারে বাবা-মায়ের সাথে ,ভাই-বোনের সাথে,সহকর্মীর সাথে কিংবা জীবন সঙ্গীর সাথে।বছরের শুধু এই একটি দিন বন্ধু দিবস নয়।বছরের প্রতিটি দিনই আমাদের বন্ধু দিবস। কারণ অন্যদের ছাড়া বাঁচা গেলেও বন্ধু ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল!!!

লেখাঃ তাহরিমা মাহজাবিন
রসায়ন বিভাগ
সরকারি তিতুমীর কলেজ