রাজধানীর পল্লবী থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছে। বিস্ফোরণের রাতে গ্রেফতার তিনজনকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাদেরকে ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, এটি স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার সংশ্লিষ্ট একটি অপরাধমূলক কর্মকান্ড। এখানে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অপরদিকে গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে রফিক ও শহিদকে ঘটনার দুই দিন আগে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার ও স্বজনরা।

জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পায়নি ডিবি : আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন জানান, পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় দু’টি মামলা হয়েছে। যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে আমরা যা পাচ্ছি এটা ‘স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার সংশ্লিষ্ট একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। জঙ্গির কোনো সংশ্লিষ্টতা আমরা এখনও পাইনি। তারা কেন কাকে কীভাবে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করেছিল সে বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। এর বেশি কিছু পেলে আমরা পরবর্তীতে জানাবো।

দুটি মামলা : পল্লবী থানার এসআই ফারুকুজ্জামান মল্লিক জানান, থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুটি মামলা দায়ের করেছে। একটি অস্ত্র আইনে, আরেকটি বিস্ফোরক দ্রব নিয়ন্ত্রণ আইনে।

এই মামলার তদন্ত করছেন ফারুকুজ্জামান মল্লিক। তিনি বলেন, থানায় বিস্ফোরণের আগে আমরা শহিদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম ও মোশারফ নামে তিনজনকে গ্রেফতার করেছিলাম। তাদেরকে ওই দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

এদিকে রফিক ও শহিদুলকে গ্রেফতার নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার রাতে তাদেরকে গ্রেফতারের কথা পুলিশ জানালেও অভিযোগ উঠেছে তাদেরকে দুই দিন আগে গ্রেফতার করা হয়। রফিক ও শহিদের পরিবার-স্বজন এই অভিযোগ করে বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলেও পুলিশ গাড়িতে তাদের তুলে নেয় পুলিশ। অবশ্য ঘটনার পর থানা পুলিশ এবং ডিএমপির ক্রাইম ও ডিবির কর্মকর্তাদের মধ্যে এই গ্রেফতার নিয়ে বক্তব্য ছিল অস্পষ্ট এবং একেক ধরণের।

১৪ দিনের রিমান্ডে ৩ আসামী : পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের মামলায় গ্রেফতার তিন আসামী রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফকে ১৪ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম মঈনুল ইসলামের আদালতে এই আদেশ দেন। বিকেলে আসামীদে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পল্লবী থানার অস্ত্র মামলায় সাত ও বিস্ফোরক আইনে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফারুকুজ্জামান মল্লিক।

অন্যদিকে তাদের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত অস্ত্র মামলায় সাত দিন ও বিস্ফোরক আইন মামলায় সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্ত কমিটি গঠিত : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (গণমাধ্যম) ওয়ালিদ হোসেন জানান, পল্লবী থানায় বিস্ফোরণে চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হওয়ার ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বুধবার রাতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে ডিএমপি। কমিটির প্রধান হলেন যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) শাহ আবিদ হোসেন। অপর দুই সদস্য হলেন-ডিএমপির দারুস সালাম জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী ও স্পেশাল এ্যাকশন গ্রæপের অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহ চৌধুরী। কমিটিকে আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

পূর্বসূত্র : ২৯ জুলাই ভোরে পল্লবী থানা ভবনে ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ বলছে, আগের দিন (২৮ জুলাই) মধ্যরাতে মিরপুরের কালসী থেকে দু’টি আগ্নেয়াস্ত্র, চার রাউন্ড গুলি ও একটি ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের মত ডিভাইসসহ তিনজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হয়। পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষে ওজনমাপার যন্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইমরান, এসআই সজীব, পিএসআই অঙ্কুর, পিএসআই রুমি ও রিয়াজ নামে পুলিশের এক সোর্স আহত হয়।

ঘটনার পর পল্লবী থানা ভবন পরিদর্শন শেষে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, যে তিনজনকে আমরা গ্রেফতার করেছি, তারা কোনো জঙ্গি গ্রæপের সদস্য নয়। তারা কোনো না কোনো ক্রিমিনাল গ্রæপের সদস্য। ওজন মেশিনসদৃশ বস্তু যা ছিল, সেটার ভেতরেই এই এক্সপ্লোসিভগুলো ছিল। একটির বিস্ফোরণ ঘটেছে। পরে আরও দুটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে এটি কোনো জঙ্গি ঘটনা নয়।’

দায় স্বীকার আইএসআইএস’র : বুধবার রাতে থানায় বিস্ফোরণের ঘটনার দায় স্বীকার করেছে কথিত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস বা আইএস)। জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স এ খবর জানায়।

এই বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় আইএস মিথ্যা দায় স্বীকার করেছে। গণমাধ্যমের প্রচারণা পেতেই আইএস এ কাজটি করছে বলে আমার ধারণা।’