দেশে আজ করোনার ভয়াল থাবা। কিছুতেই পিছু হটছেনা এই মহামারি করোনা ভাইরাস। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। দেশে ইতোমধ্যে বৃদ্ধি করা হয়েছে করোনা পরিক্ষার ল্যাব। যা অত্যান্ত সুখবর । কারণ করোনার নমুনা পরিক্ষার ল্যাব যত বেশি বৃদ্ধি পাবে ততবেশি নমুনা সংগ্রহ করা যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না! ফলাফল তার উল্টো। গতকাল ১১ জুলাই ৭৭টি ল্যাবে করোনা পরিক্ষা হয়েছে ১১ হাজার ১৯৩টি। ল্যাব বাড়ার সাথে সাথে হঠাৎ কাকতালিয় ভাবে কমে গেছে করোনার নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা। অন্যদিকে কিটের সংকটে অনেক ল্যাবের সক্ষমতা সত্বেও শনাক্ত কাজ চলছে ঢিলেঢালা ভাবে।

দেশে এখন পর্যন্ত মোট ৭৭টি ল্যাব রয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনে দেশে নতুন ছয়টি আরটি-পিসিআর ল্যাব যুক্ত হয়েছে। এতে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা থাকলেও উল্টো নমুনা পরিক্ষা অনেক কমেছে। গত ১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর ঘোষিত ফলাফলে ১৬ হাজার ৮৯৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে বলে জানানো হয়। আর গতকাল ১১ই জুলাই জানানো হয়েছে, নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১১ হাজার ১৯৩টি। অর্থাৎ ১ জুলাইয়ের তুলনায় গতকাল পরীক্ষা কম হয়েছে ৫ হাজার ৭০৫টি। অথচ ১ জুলাইয়ে করোনা পরিক্ষা করা হয় ৬৯টি ল্যাবে আর গতকাল পরিক্ষা করা হয় ৭৭টি ল্যাবে। এতে ল্যাব বৃদ্ধি পেলেও কমে গেছে করোনা শনাক্তের সংখ্যা।

জুনের শেষ ১০ দিনের সাথে জুলাইয়ের প্রথম ১০দিনের সাথে তুলনা করলে আমরা দেখতে পাই ২১ জুন নমুনা পরীক্ষা ১৫ হাজার ৫৮৫টি ,২২ জুন নমুনা পরীক্ষা ১৫ হাজার ৫৫৫টি ,২৩ জুন নমুনা ১৬ হাজার ২৯২টি , ২৪ জুন পরীক্ষা ১৬ হাজার ৪৩৩টি ,২৫ জুন পরীক্ষা ১৭ হাজার ৯৯৯টি, ২৬ জুন পরীক্ষা ১৮ হাজার ৪৯৮টি , ২৭ জুন নমুনা পরীক্ষা ১৫ হাজার ১৫৭টি, ২৮ জুন ১৮ হাজার ৯৯টি, ২৯ জুন ১৭ হাজার ৮৩৭টি ও ৩০ জুন ১৮ হাজার ৪২৬টি মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৪৪৯টি। সর্বোমোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৮৭ টি।

অন্যদিকে ১ জুলাই নমুনা পরিক্ষা করা হয় ১৬ হাজার ৮৯৮টি। সর্বোচ্চ সংখ্যক পরীক্ষা হয়েছে ২ জুলাই। সে দিন মোট ১৮ হাজার ৩৬২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া ৩ জুলাই ১৪ হাজার ৬৫০টি, ৪ জুলাই ১৪ হাজার ৭২৭টি, ৫ জুলাই ১৩ হাজার ৯৮৮টি ও ৬ জুলাই ১৪ হাজার ২৪৫টি, ৭ জুলাই ১৩ হাজার ১৭৩ টি, ৮ জুলাই ১৫ হাজার ৬৭২টি , ৯ জুলাই ১৫ হাজার ৬৩২টি, ১০ জুলাই ১৩৪৮৮টি নমুনা পরীক্ষার তথ্য জানানো হয়। জুলাইয়ের ১ম ১০ দিনে মোট নমুনা পরিক্ষা করা হয় ১লাখ ৫০ হাজার ৮৩৫টি। সব মিলিয়ে জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনের সাথে জুনের শেষ ১০ দিনের পার্থক্য করে দেখা যায় মোট নমুনা পরিক্ষা কমেছে ২১ হাজার ২৫২টি।

করোনার নমুনা পরিক্ষা কমে যাওয়ার কারণে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের প্রতি অভিযোগ জানিয়ে বলেন, নমুনা পরিক্ষা কমিয়ে দেওয়ার কারণে আক্রান্ত ও কমে গেছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিভাগ ‘নো টেষ্ট নো করোনা’ এই পথ ধরেই হাটছেন। সাধারণ কিছু মানুষের সাথে কথা বললে তারা দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিনকে জানান, গত ২ জুলাই সর্বোচ্চ নমুনা পরিক্ষা হয়েছে এবং একই দিন সর্বোচ্চ করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাই করোনার নমুনা পরিক্ষা বাড়ানো হলে আক্রান্তের সংখ্যা ও বাড়বে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু নমুনা পরিক্ষা বাড়ার বদলে উল্টো কমে যাচ্ছে যা স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের চরম ব্যর্থতা।

এদিকে গত ২৮ জুন দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাই ধারণা করা হচ্ছে করোনা পরিক্ষার ফি নির্ধারণ করার কারণে অনেকেই পরিক্ষা করাতে চায় না। তাই নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা কমেছে।

প্রজ্ঞাপন জারির আগের ৭ দিন (২১ থেকে ২৭ জুন) এবং পরের ৭ দিনের (১ থেকে ৭ জুলাই) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফি চালুর আগের ৭ দিনে সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্তের নমুনা সংগ্রহ হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭২৫টি এবং ফি চালুর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ১৫৩টি। অর্থাৎ ফি চালুর পর এক সপ্তাহে নমুনা সংগ্রহ কমেছে ১১ হাজার ৫৭২টি। ফি চালুর আগের ৭ দিনে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৫৭টি এবং ফি চালুর পরে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩২০টি। অর্থাৎ ফি চালুর পর পরীক্ষা কমেছে ৮ হাজার ৮৩৭টি। ফি চালুর আগের ৭ দিনে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ২০৭ জনের এবং ফি চালুর পরে শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৬২ জনের। অর্থাৎ ফি চালুর পরের ৭ দিনে শনাক্ত কমেছে ২ হাজার ৪৫টি। যার কারণে এটিকে অনেকটা কৌশল হিসেবেও দেখছে অনেকে।

এদিকে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে যতগুলো নমুনা সংগ্রহ করা হয় তারচেয়েও কমপক্ষে ৪০০-৫০০ টি নমুনা কম পরিক্ষা করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন নমুনা নিয়ে রেখে পরীক্ষা করতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে এর গুণগত মান। দীর্ঘদিনের রেখে দেওয়া নমুনা থেকে ফল না আসায় অনেক সময় পুনরায় নমুনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অধিকাংশ হাসপাতালে এর চেয়ে বেশি নমুনা শনাক্তে সক্ষমতা ও জনবল থাকলেও মিলছে না চাহিদামাফিক কিট। ফলে নমুনা সংগ্রহ করলেও পরীক্ষা হচ্ছে কম। দেশে দেশে যেভাবে করোনায় আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এ সময় করোনা পরীক্ষায় কিটের স্বল্পতা এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান বিভিন্ন হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা। কিটের সংখ্যা বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্রান্তিকালে কিটের সংকট ভীষণ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কেননা, এর কারণে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই বিলম্বিত হচ্ছে তা নয়, কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠেছেন কিনা তাও জানা যাচ্ছে না।

তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের জনসংখ্যার বিচারে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের করোনা পরীক্ষা করছে না। এখনো প্রতিদিন করোনা পরীক্ষা ১৬ হাজারের মধ্যে রয়েছে, যা অন্তত ২০ হাজার হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত দেশে ৯ লাখ ১৮ হাজার ২৭২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাবে বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের প্রতি ১০ লাখ লোকের মধ্যে ৫ হাজার ৪১৬ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার প্রতি ২৫০ জনে একজনকে পরীক্ষা করতে পারছে। দেশে করোনা মহামারীর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। দেশে করোনাভাইরাস মহামারীর এই সময় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে করোনা প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। নমুনা পরীক্ষার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এক দিনে সর্বোচ্চ ১৮ হাজারের কাছাকাছি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কয়েকদিন ধরে তা আবার কমে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে ব্যবহৃত আরটিপিসিআর মেশিনে লাল এবং হলুদ দুই ধরনের কিট ব্যবহার হয়। হলুদ মেশিনের কিট সঠিক সময়ে আমদানি না করায় ঠিকমত পরিক্ষা করা সম্ভব হয় না। কিছু মেশিন পুরনো মডেলের হওয়ায় সেগুলোর কিট পাওয়াও মুশকিল হয়ে পড়েছে। কিট ও মেশিন আমদানিতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের যোগসাজশও রয়েছে।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে টেস্টের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এজন্য ল্যাব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু ল্যাব বাড়ানোর পরও যদি টেস্ট না বাড়ে তাহলে লাভ নেই। যত দ্রুত আক্রান্ত শনাক্ত করে তাদের আলাদা করা যাবে তত দ্রুত আমাদের সংক্রমণের হার কমবে।